রুকইয়াহ কী? এব্যাপারে শরিয়াতের বিধান কী?


রুকইয়াহ মানে কী?
রুকইয়াহ অর্থঃ #ঝাড়ফুঁক, #মন্ত্র, #তাবিজ... ইত্যাদি। আর রুকইয়াহ শারইয়্যাহ মানে শরিয়াত সম্মত রুকইয়াহ। তবে রুকইয়া শব্দটি সচরাচর ঝাড়ফুঁক করা বুঝাতে ব্যাবহার হয়, এই ঝাড়ফুঁক সরাসরি হতে পারে, অথবা কোনো পানি বা খাদ্যের ওপর করে সেটা ব্যাবহার হতে পারে। সবগুলোই সালাফ থেকে প্রমাণিত।

. আমাদের লেখাগুলোতে রুকইয়াহ শোনার কথা এসেছে/আসবে বারবার, সেটা হচ্ছে কোরআন যেসব আয়াত ঝাড়ফুঁক এর জন্য বেশি ইফেক্টিভ সেসবের রেকর্ড ফাইল। তিলাওয়াতের রেকর্ড শোনা যদিওবা সরাসরি শোনার মত প্রভাব ফেলে না, তবুও এটা যথেষ্ট উপকারী এবং ক্ষেত্র বিশেষে এর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের উপহাদেশে এর প্রচলন কম, আরব দেশগুলো এবং ওয়েস্টার্ন কান্ট্রির মুসলমানদের মাঝে এটা খুব প্রসিদ্ধ।

. এবিষয়ে শরয়ী বিধানের সারকথা হচ্ছে- "কোরআনের আয়াত বা হাদীসে বর্ণিত দু'আ নিজে পড়া, সেটা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা, লিখে বাচ্চাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে আকিদা সহীহ রাখতে হবে, দু'আ ঝাড়ফুঁক এর কোনো ক্ষমতা নাই, এসব আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার একটা পন্থা মাত্র.."

. দলীল

আসুন এবার দলিল-আদিল্লাহ দেখা যাক, এখানে উল্লেখিত অনেক হাদিস আমরা ইতিমধ্যে রুকয়া সিরিজে আলোচনা করেছি।
একজন বান্দি আয়েশা রা. এর কাছে এসেছিলো ঝাড়ফুঁক এর জন্য, এমতাবস্থায় রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসলেন। তখন ওই বান্দিকে দেখে রাসুল সা. বললেন- "কোরআন দ্বারা এর চিকিৎসা করো!" (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬২৩২)

. সহীহ বুখারিতে এরকম একটা ঘটনা আছে যেটায় উম্মে সালামা রা. এর ঘরে একজন মেয়ে এসেছিল, তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে ছিল। রাসুল সা. দেখে বললেন- "এ বদনজর আক্রান্ত হয়েছে, এরজন্য রুকয়া/ঝাড়ফুঁক করো"

. এখানে রাসূল সা. কোনো নিয়ম ধরে বেঁধে দেননি যে কিভাবে করবে না করবে। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারছি এব্যাপারে প্রশস্ততা আছে।

. দ্বিতীয় হাদিসটা বেশ লম্বা, আগেও এর আলোচনা হয়েছে। হাদিসের সারকথা হচ্ছে-

"কতক সাহাবী জিহাদ থেকে ফেরার পথে রাতে এক যায়গায়, সেখানে এক বেদুইন গোত্রের বসতি ছিল। তাদের মেহমানদারী করতে অনুরোধ করলে তারা অস্বীকার করে। পরে সাহাবিরা নিজেরাই তাবু-টাবু টাঙ্গিয়ে ব্যবস্থা করে নেন। ঘটনাক্রমে বেদুঈনদের সর্দারকে বিচ্ছু কামড়ায়, তখন ওরা সাহাবিদের কাছে হেল্প চায়। এবার সাহাবিরা পারিশ্রমিক ছাড়া রাজি হয়না, পরে একপাল ভেড়া দেয়ার শর্তে সাহাবাদের একজন ওই সর্দারকে ঝাড়ফুঁক করলে সে সুস্থ হয়ে যায়। পরে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ হবে কিনা এব্যাপারে নিশ্চিত হতে মদিনায় ফেরার পর রাসূল সা.-কে ঘটনা জানায়, ইয়া রাসূলুল্লাহ ঘটনাতো এরকম আমি সুরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়েছিলাম, এর বদলায় পারিশ্রমিক হিসেবে এগুলা নিলে কি জায়েজ হবে? রাসুল সা. ঘটনা শুনে হাসলেন, বললেন- তুমি কিভাবে বুঝলে যে, এটি (সূরা ফাতিহা) একটি রুক্বইয়াহ!! আচ্ছা, তোমরা এগুলো (ভেড়া) বণ্টন করে নাও এবং সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রেখো।
- (বুখারি হাদিস নং ২১৩২, এছাড়া মুসলিম, তিরমিযি, আহমাদ ইত্যাদি অনেক কিতাবে হাদিসটি আছে)

. এখন এখানে আমাদের দেখার বিষয় হচ্ছে, সাহাবাদের ট্যালেন্ট দেখে আর কোরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতে দেখে রাসূল সা. খুশি হয়েছেন। আর রাসূল সা. এর কথা "তুমি কিভাবে জানলে এটা রুকয়া?" এথেকে বুঝা যায় রাসূল সা. ঝাড়ফুঁকের জন্য সুরা ফাতিহার কথা স্পেসিফিকভাবে সাহাবাদের বললেননি, বরং আগের হাদিসের মত এখানেও প্রশস্ততা রেখেছিলেন।

এই হাদিসে অনেক কিছু শেখার আছে, ইমাম বুখারী রহ. শুধু এই হাদিসই অনেকবার এনেছেন।

. [গ.] বুখারীতে 'তাগুতের অত্যাচার সহ্য করার প্রতিদান" অধ্যায়ের পর থেকে "কোমল হওয়া" অধ্যায়ের আগে পর্যন্ত ঝাড়ফুঁকের অনেকগুলো অধ্যায় আছে, সেখানে রাসূল সা. যেসব দু'আ পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন তার কিছু কিছু উল্লেখ আছে।

. সেখানে কোনো হাদিসে দেখবেন- সাহাবারা কাউকে ঝাড়ফুঁক করেছে, কখনো রাসূল হুকুম দিয়েছে করতে, রাসূল সা. দোয়া পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে নিজ শরীরে বুলিয়ে নিয়েছেন, জিবরীল আ. বিভিন্ন দু'আ পড়ে রাসূল স.কে ঝাড়ফুঁক করেছেন, শেষ সময়ে রাসূল সা. যখন অনেক অসুস্থ ছিলেন তখন আয়েশা রা. বিভিন্ন সুরা বা দো'আ পড়ে রাসূল সা. এর হাতে ফু দিয়ে সেই হাত রাসূল সা. এর শরীরে বুলিয়ে দিতেন। আগ্রহীরা চাইলে অধ্যায়গুলো মুতালা'আ (স্ট্যাডি) করতে পারেন।

. এসবই বৈধ, ইসলাম যে ব্যাপারে প্রশস্ততা রেখেছে আমাদের অধিকার নাই সেটা সংকীর্ণ করার।

. [ঘ.] আচ্ছা প্রথমে যে হাদিসটা উল্লেখ করেছিলাম, ইমাম আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রহ. হাদিসটা বর্ণনা করার পর নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, উনি বলছেন- "রাসুল সা. কোরআন দ্বারা চিকিৎসা করো বলতে হয়তো বুঝিয়েছেন কোরআন যেভাবে চিকিৎসা করা বা ঝাড়ফুঁক করা বৈধ বলছে সেভাবে করো। জাহিলিয়্যাতের যামানায় বিভিন্ন শিরকি তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা হতো, এর বিপরীতে রাসুল সা. কোরআন যা জায়েজ বলে তা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতে উৎসাহ দিয়েছেন।"

. এতগুলো হাদিস এরপর মুহাদ্দিসিনে কিরামের মন্তব্য দেখে আমরা বুঝতে পারছি এব্যাপারে যারা এখন আপত্তি করছে তারা নিসন্দেহে ভুঁইফোড় কোনো বিদআতি শায়খের কথায় বিভ্রান্ত হয়েছে। এজন্য ইসলাম সম্পর্কে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করছে!
তাওহিদ সম্পর্কে তাঁর মৌলিক জ্ঞানই নেই।

. সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে- "রাসূল সা. এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি সুরা ফালাক আর সুরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন।"
এখন কেউ যদি বলে ঝাড়ফুঁক করা শিরক নিঃসন্দেহে সে রাসুল সা. এর ওপর শিরকের অপবাদ দিলো।

. [ঙ.] শেষকথাঃ রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে উলামাদের মতামতের সারকথা হচ্ছে- যদি ঝাড়ফুঁকে শিরকি কিছু না থাকে তাহলে সেটা বৈধ হবে। এক্ষেত্রে সতর্কতাবশত কোরআন এর আয়াত অথবা দু'আয়ে মাসুর (যা হাদিস বা আসারে সাহাবায় আছে) এসব দ্বারা করা উত্তম।

. দলিল হিসেবে একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়, হাদিসটি মুসলিম শরিফের।
"...আওফ ইবনু মালিক আশজাঈ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাহেলী যুগে বিভিন্ন মন্ত্র দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করতাম। তাই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এব্যাপারে আপনার কি অভিমত? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার কাছে পেশ করতে থাকবে, যদি তাতে শিরক না থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ইফাঃ ৫৫৪৪, ইসলাম ওয়েব ২২০০)
এটা হলো ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ইসলামের বিধান, যে রাসুল সা. জাহেলি যুগের মন্ত্র দিয়েও ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন। শর্ত হচ্ছে, তাতে যেন শিরক না থাকে। ব্যাস!
. সবচে বড় কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার বাণী-
""আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা এবং রহমত। আর জালেমদের জন্য তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়!"
এখন আল্লাহর কথা অনুযায়ী যদি কোরআন তিলাওয়াত করে কেউ যদি উপকার পায়, তাহলে অবশ্যই অন্যকে উপদেশ দিবে।
কারণ রাসূল সা. বলেছেন- "মঙ্গলকামনাই হচ্ছে দ্বীন!" (বুখারী ও মুসলিম)
শাইখ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ

276 total views, 5 views today

Facebook Comments